কোরিয়ার উৎসবের রাস্তা — যেখানে ৯ ঘণ্টার জ্যাম বলে দেয় পরিবারের মূল্য
চুসোক উৎসবে কোরিয়ার হাইওয়েতে ৯ ঘণ্টার জ্যাম। সিউল থেকে বুসান, ৬১৬ লক্ষ গাড়ি একসঙ্গে। জ্যামের ভিতরেও থেমে থাকে না পরিবারের টান — এই যাত্রার গল্প শুনুন।

কোরিয়ার চুসোক উৎসবে সিউল থেকে বুসান যেতে ৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট লেগেছে — এই খবর বেরোলো সম্প্রতি। স্বাভাবিক সময়ে চার ঘণ্টারও কম লাগে এই পথে। কিন্তু উৎসবের দিনে? দ্বিগুণেরও বেশি। কোরিয়ার উৎসব মানেই এমন। জানা থাকলেও, জ্যাম হবে জেনেও, তবু লক্ষ লক্ষ মানুষ বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে এই যাত্রার ভিতরেই।
একদিনে ৬১৬ লক্ষ গাড়ি — উৎসবের ট্রাফিক জ্যাম কতটা বিশাল
কোরিয়ার এক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এবছর চুসোক ছুটির প্রথম দিন সারাদেশের হাইওয়েতে ৬১৬ লক্ষ গাড়ি চলাচল করেছে। রাজধানী এলাকা থেকে প্রদেশের দিকে ৫১ লক্ষ, উল্টোদিকে ৩৮ লক্ষ গাড়ি — একসাথে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে জ্যাম চরমে পৌঁছায়। রাত ৮-৯টার দিকে তবে একটু ছাড়ে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু ট্রাফিক ডেটা নয়। এগুলো বলে দেয় কোরিয়ান সমাজে 'উৎসব' মানে আসলে কী। পরিবার, শিকড়, নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়া — এসবের ওজন কতখানি।
কিয়ংবু হাইওয়ের সিনগাল জংশন থেকে শুরু করে সুওন, কিহুং, নামি জংশন পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকায় গাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে। জুংবু হাইওয়েতেও একই অবস্থা — হানাম থেকে নাম-ইচিওন পর্যন্ত একের পর এক সেকশনে স্পিড শূন্যের কোঠায়। গাড়ির ভিতরে আটকে থাকা সময়টা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর। কিন্তু মানুষ তাও মানিয়ে নেয়। সঙ্গে আনা স্ন্যাকস বের করে, রেডিও চালায়, বাচ্চাদের হাতে গেম ধরিয়ে দেয়। জ্যাম অস্বস্তিকর, কিন্তু কোরিয়ানদের কাছে এটা যেন একটা পরিচিত আচার — উৎসবে যাওয়ার পথে পেরোতে হয় এমন একটা ধাপ।
এত কষ্ট করেও কেন যায় মানুষ — ঘরে ফেরার সাংস্কৃতিক অর্থ
চুসোক মানে শুধু ছুটি নয়। পরিবারের সবাই এক টেবিলে বসা, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে প্রার্থনা, গ্রামের খাবার একসাথে ভাগ করে খাওয়া — এসবই এখনও অনেক কোরিয়ানের কাছে অপরিহার্য। সিউল আর রাজধানী এলাকায় জনসংখ্যা কেন্দ্রীভূত হওয়ায়, উৎসব হয় সেই ঘনত্বকে সাময়িকভাবে উল্টে দেওয়ার সময়। বুসান, দাইগু, কোয়াংজু, মোকপোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আত্মীয়রা আবার জড়ো হয়, আর সেটার একমাত্র পথ হাইওয়ে পেরিয়ে।
জ্যাম জেনেও বেরোনোর কারণ, এই সময়টাকে 'অদক্ষতা' দিয়ে মাপা যায় না। গাড়ির ভিতরে আড্ডা, রেস্ট স্টপে হোডু-গোয়াজা (আখরোটের কেক) আর ওমুক (ফিশকেক) খাওয়া, জানালা দিয়ে দেখা ছোট শহরের দৃশ্য — এসবই ঘরে ফেরার অংশ। উৎসবের ট্রাফিক জ্যাম কষ্টকর বটে, কিন্তু তার ভিতরে আছে কোরিয়ান সমাজ এখনও 'পরিবার' আর 'শিকড়' নামের মূল্যবোধকে কীভাবে আঁকড়ে ধরে আছে — সেই গল্প।
রেস্ট স্টপ — জ্যামের মাঝে ছোট্ট বিরতি
হাইওয়ে রেস্ট স্টপ মানে ঘরে ফেরার পথে এক-একটা ল্যান্ডমার্ক। জ্যাম যত বেশি, রেস্ট স্টপের পার্কিংও তত ভর্তি। টয়লেটের সামনে লম্বা লাইন। তবু মানুষ গাড়ি দাঁড় করায়, নামে। একটু পা মেলে নেওয়া, গরম ওমুক-এর ঝোল এক চুমুক খাওয়া, বাচ্চারা কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে চিপস বাছাই করা — এই সবই মিলে ছোট্ট একটা ইভেন্ট হয়ে যায়। রেস্ট স্টপ মধ্যবর্তী পয়েন্ট বটে, কিন্তু উৎসবের সফরের একটা আলাদা স্মৃতিও।
আজকাল রেস্ট স্টপ নিজেই কন্টেন্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় পণ্যের কর্নার, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল বেকারি, লিমিটেড এডিশন সুভেনির — এসব দেখতে দেখতে জ্যামের অপেক্ষাটা কেটে যায়। অনেক সময় এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় যা আশা করিনি। এই মুহূর্তগুলো জমা হতে হতে ঘরে ফেরার পথটা আর শুধু 'যত দ্রুত পৌঁছানো যায়' সেরকম কিছু থাকে না — হয়ে ওঠে 'নিজের মতো একটা অভিজ্ঞতা'।
উৎসবের যাতায়াতের ভবিষ্যৎ — বিকেন্দ্রীকরণ আর পরিবর্তনের ইশারা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের যাতায়াত প্যাটার্নেও পরিবর্তন টের পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে ছুটি ভেঙে নিচ্ছে, আবার কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে 'রিভার্স হোমকামিং' — মানে বাবা-মা-ই চলে আসছেন ছেলেমেয়ের শহরে। তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী ঘরে ফেরার ধাঁচ থেকে একটু একটু করে মুক্ত হচ্ছে। তবু লক্ষ লক্ষ গাড়ি এখনও হাইওয়ে ভরিয়ে দেয় — কারণ উৎসবের প্রতীকী মানে এত সহজে মুছে যায় না।
ট্রেন, বাস ইত্যাদি গণপরিবহণ ব্যবহারকারীর সংখ্যা একটু বাড়ছে বটে, কিন্তু নিজের গাড়িতে যাওয়া মানুষই এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। ঘর থেকে ঘর, দরজা পর্যন্ত সব মালপত্র নিয়ে যাওয়া যায় — এই সুবিধা। আর সবচেয়ে বড় কথা, 'আমাদের পরিবারের নিজস্ব যাত্রা' — এই ব্যক্তিগত জায়গার মূল্য। এসবই ঘরে ফেরার গাড়ির মিছিলকে টিকিয়ে রাখছে।
আরও কোরিয়ান সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন গল্প পড়ুন K-Blog-এ।
জ্যামের ভিতরেও — যাত্রা থামে না
৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট লাগলেও, আগামী বছরও হয়তো একই দৃশ্য দেখা যাবে। চুসোকের আগের রাত থেকে রওনা দেওয়া গাড়ি, ভোরবেলা হাইওয়েতে হেডলাইটের সারি, রেস্ট স্টপে কফি খেয়ে ঘুম তাড়ানো মানুষ। এসবই কোরিয়ার উৎসবের ছবি। অদক্ষ, ক্লান্তিকর, মাঝেমধ্যে বিরক্তিকরও — তবু থামে না।
এই যাত্রার ভিতরে মিশে আছে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, নিজের শিকড়ের প্রতি টান, আর বছরে কয়েকবার পাওয়া লম্বা বিশ্রামের প্রত্যাশা। কোরিয়ার উৎসবের হাইওয়ে শুধু একটা রাস্তা নয়। এ হলো সেই জায়গা যেখানে কোরিয়ান সমাজ এখনও যে মূল্যবোধগুলোকে সম্মান করে, সেগুলো শারীরিকভাবে প্রকাশ পায়। জ্যাম যত দীর্ঘ হয়, তার ভিতরের অর্থ তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাধারণ প্রশ্ন
- চুসোক উৎসবে কোরিয়ার হাইওয়েতে জ্যাম কখন সবচেয়ে বেশি হয়?
- সাধারণত ছুটির প্রথম দিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে জ্যাম সবচেয়ে বেশি হয়। এই সময় রাজধানী এলাকা থেকে প্রদেশের দিকে যাওয়া গাড়ির চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। রাত ৮-৯টার দিকে তবে একটু ছাড়তে শুরু করে।
- উৎসবের ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে কখন রওনা দিলে ভালো?
- খুব ভোরে (সকাল ৫-৬টার আগে) অথবা দেরি রাতে (রাত ১০টার পরে) রওনা দিলে তুলনামূলক কম জ্যাম হয়। আরেকটা উপায় হলো ছুটির একদিন আগে বা একদিন পরে বেরোনো। তবে পরিবারের সময়সূচির সাথে মেলাতে হয় বলে আসল জীবনে অপশন বেশ সীমিত।
- হাইওয়ে রেস্ট স্টপে কোন খাবারগুলো অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত?
- হোডু-গোয়াজা (আখরোটের কেক) হলো কোরিয়ান হাইওয়ে রেস্ট স্টপের ক্লাসিক আইটেম। গরম ওমুক (ফিশকেক) আর তার ঝোল, হটডগ, সফট আইসক্রিমও জনপ্রিয়। আজকাল প্রতিটা রেস্ট স্টপের নিজস্ব সিগনেচার খাবার থাকে, তাই আগে থেকে খোঁজ নিয়ে যাওয়া মজার।
- রিভার্স হোমকামিং (বাবা-মায়ের ছেলেমেয়ের কাছে আসা) বাড়ছে কি?
- পরিসংখ্যানে এখনও ঐতিহ্যবাহী হোমকামিং (ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের গ্রামে যাওয়া) সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, বিশেষত ছোট বাচ্চা থাকা পরিবারগুলোয়, রিভার্স হোমকামিং একটু একটু বাড়ছে — মূলত যাতায়াতের ঝামেলা কমানোর জন্য।




